মোঃ লিহাজ উদ্দীন মানিক, প্রতিনিধি, পঞ্চগড় ঃ পঞ্চগড়সহ উত্তরের কয়েকটি জেলায় আশ্বিন-কার্তিক মাসে এখন আর অভাব নেই। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও এই এলাকাকে ‘মঙ্গা’ এলাকা হিসেবে বিবেচিত করা হত। হাতে কোন কাজ না থাকায় এই এলাকার অনেক অভাবি মানুষগুলোকে থাকত অর্ধাহারে-অনাহারে। ভাতের বিকল্প হিসেবে এই সময়টাতে কচুর মুড়া আর কাউনের ভাতই ছিল তাদের প্রধান খাবার। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে এখন দিন বদলে গেছে। অনেকেই এই সময়টাতে আগাম জাতের আমন ধান আবাদ করে অভাব তাড়িয়েছে। আগাম জাতের ধান আবাদ করায় এক মাস আগেই তারা ঘরে তুলছে সোনালী ধান। পঞ্চগড়সহ উত্তরের রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় কৃষকদের ঘরে ঘরে এখন শুরু হয়েছে আগাম নবান্ন উৎসব। আগাম জাতের ধান কেটে কাঁচা খড় অধিক দামে গো-খাদ্য হিসেবে বিক্রয় করতে পারছেন কৃষকরা। সেই সাথে কৃষকরা ওই জমিতে আগাম আলু, সরিষা, গমসহ বিভিন্ন ধরণের শীতকালীন শাক-সবজি আবাদ করে তারা অধিক লাভবান হচ্ছেন। পঞ্চগড়সহ উত্তরের কয়েকটি জেলায় সাধারণত আমন ধান কাটার উপযোগি হয় অগ্রহায়ণের শুরু থেকে। সম্পূর্ণ প্রকৃতি নির্ভর এই আমন ধান চাষ চলে আসছে শত শত বছর ধরে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর বর্ষায় প্রকৃতি তার রূপ বদলাচ্ছে। কোন বছর অধিক বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যায় সাবাড় হচ্ছে কৃষকের আমন ক্ষেত। আবার কোন কোন বছর পানির অভাবে কৃষকরা আমন ধান আবাদ করতেই পারছে না। আবার সামান্য বৃষ্টিতে লাগানো ধান কয়েকদিনের প্রচন্ড খরায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ প্রতিকুল অবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউট-ব্রি ও আন্তর্জাতিক ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউট-ইরি’র উদ্ভাবিত নতুন জাতের আমন ধান আবাদে উদ্ভুদ্ধ হচ্ছে কৃষকরা। সামান্য পানিতে আগাম জাতের ধান আবাদ করে ১১০ থেকে ১১৫ দিনের মধ্যে সেই ধান কাটতে পারছে কৃষকরা। পুরোনো জাতের আমন ধানের চেয়ে অনেক বেশী ফলন পাচ্ছেন তারা। অভাবের সময় নতুন ধানে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ধান বাজারে বিক্রয় করে দিতে পারছেন তারা। আবার বাজারে নতুন ধানের দাম কিছুটা কম হলেও ধানের কাঁচা খড় তারা অনেক বেশী দামে বিক্রয় করতেও পারছেন। বর্তমানের ছোট আকারের এক আটি কাঁচা খড় বাজারে বিক্রয় হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা পর্যন্ত। এবার পঞ্চগড় জেলায় বর্ষা মৌসূমের শুরুতেতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত কিছুটা কম হলেও কৃষক সেচ দিয়ে হলেও আগেভাগেই জমিতে চারা রোপন করেছিল। মৌসূমের শেষে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতে বন্যা সৃষ্টি হলেও কৃষকের জন্য তা অশির্বাদ বয়ে এনেছে। কঠোর পরিচর্যা এবং সময়মত সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করায় এবার ফলনও আসছে বেশ ভাল। নতুন জাতের ব্রি ধান-৩৩, ৫৬, ৬২, ৭২, বিনা-৭সহ বিভিন্ন জাতের আমন ধান বিঘা প্রতি ফলন পাওয়া যাচ্ছে ১২ থেকে ১৮ মণ পর্যন্ত। এ কারণে কৃষকরা মান্ধাতা আমলের পাইজাম, লোহাজাং, কলম, সমনজারী, পানাতি, নেহিহা, মানসেরা, পঙ্খীরাজ, কাসুয়া বিন্নি, সাপাহার, আসামী, নায্যশালী, দুধকলমসহ বিভিন্ন জাতের ধান আবাদ বাদ দিয়ে এই ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছে। পঞ্চগড় জেলা সদরের বলেয়াপাড়া গ্রামের কৃষক পিন্টু জানান, এবার তিনি আমন মৌসূমে পারিজাত জাতের ধানের পাশাাশি এক বিঘা জমিতে ব্রি ধান-৬২ আবাদ করেছেন। ইতিমধ্যে এই ধান কাটা শেষ করেছেন। এক বিঘা জমিতে ফলন এসেছে প্রায় ১৫ মণ। যেখানে এই জমিতে অন্যান্য জাতের ধান আবাদ করে পেতেন বিঘা প্রতি মাত্র ৮ থেকে ১০ মণ। এই এক বিঘা জমিতে তিনি গম চাষ করবেন বলে জানান। তিনি আরো বলেন, আগামী বছর থেকে আমি এই জাতের ধানই আবাদ করবো। কারণ হিসেবে তিনি জানান, এক বিঘা জমির খড় তিনি গো-খাদ্য হিসেবে বিক্রয় করেছেন প্রায় তিন হাজার টাকায়। আরডিআরএস পঞ্চগড়’র কৃষি কর্মকর্তা ফিরোজ বুলবুল জানান, ধীরে ধীরে সচেতন হয়ে উঠছেন আমাদের কৃষকরা। তুলনামূলকভাবে ফলন বেশী হওয়ায় তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশী জমিতে আগাম জাতের ধান আবাদে ঝুঁকছেন। এজন্য সরকারের কৃষি বিভাগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও এই জাতের ধান আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। তিনি বলেন আরডিআরএস বাংলাদেশ’র কোর কর্মসূচি ও খাদ্য নিরাপত্তায় সুশাসন প্রকল্পের আওতায় চলতি আমন মৌসূমে পঞ্চগড় জেলায় দুই হাজার ৫৫ জন কৃষকের মাধ্যমে দুই হাজার ৫৫ বিঘা জমিতে ব্রি ধান-৫৬ ও ৬২ আবাদ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে সব ধান কাটা শেষ হয়েছে। এই জাতের ধান আবাদ করে আশানুরুপ ফলন পেয়েছে কৃষকরা। কোন কোন এলাকায় বিঘা প্রতি ফলন ২০ মণ পর্যন্ত এসেছে বলে তিনি জানান। তিনি জানান, এই জাতের ধান আবাদ করে কৃষকরা একই জমিতে বছরে চার ফসল আবাদ করতে পারছেন। এ নিয়ে কথা বললে পঞ্চগড়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক শামসুল হক বলেন, চলতি আমন মৌসূমে পঞ্চগড় জেলায় ৯৬ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে মৌসূমের শেষে বৃষ্টিতে শেষ পর্যন্ত ৯৭ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চারা রোপন করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক হাজার ১৬৫ হেক্টর বেশী। তিনি আরও বলেন, কৃষকরা এখন আগাম জাতের আমন ধান আবাদে ঝুঁকছে। কারণ সাধারণ জাতের ধানের চেয়ে এই ধান একমাস আগে কৃষকের ঘরে উঠে। আবার এই জমিতে গম-সরিষাসহ বিভিন্ন ধরণের শীতকালীন শাক সবজি আবাদ করে কৃষকরা বাড়তি টাকা আয় করতে পারে বলে তিনি জানান।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
- » বোদায় ১ মেয়র সহ ৯ জনের মনোনয়ন বাতিল
- » বোদায় গৃহবধূর রহস্য জনক মৃত্যু, আটক ১
- » বোদা পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে ৫ প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিল
- » বোদায় নৌকা প্রতিক পেলেন এ্যাডঃ ওয়াহিদুজ্জামান সুজা
- » বোদায় ধানের শীষ প্রতীক হকিকুল ইসলাম পাওয়ায় ভোটারা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হিসেব নিকেশ করছে
- » ৭মার্চ ভাষণে ইউনেষ্কো স্বীকৃতি পাওয়ায় পঞ্চগড়ে আনন্দ শোভাযাত্রা
- » বেগম জিয়ার মিশন এবার রংপুর
- » ভুরুঙ্গামারীতে ট্রাকের ধাক্কায় যুবলীগ নেতার মৃত্যু
- » ৭মার্চ ভাষণে ইউনেষ্কো স্বীকৃতি পাওয়ায় পঞ্চগড়ে আনন্দ শোভাযাত্রা
- » অযতœ অবহেলায় বোদার ঢাপঢুপ বধ্যভূমি স্বাধীনতার ৪৬ বছরে অনেকে বেঁচে আছে শরীরের ক্ষত চিহৃ নিয়ে ঢাপঢুপ বধ্যভূমির হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষকে শিউরিত করে










Leave a Reply