ছেলেকে দাহ করার আগে বিশ্বজিৎ দাসের বাবা অনন্ত দাস শেষ দেখা দেখতে গিয়েছিলেন। হাতের নিচে কোপ, পিঠে কোপের সংখ্যা কমপক্ষে আটটি, সারা শরীর রডের আঘাতে থেঁতলে গেছে। সুরতহাল করা পুলিশ সদস্য কিংবা ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক কেন এসব খুঁজে পেলেন না, সেই প্রশ্ন তাঁর। সুবিচার পাওয়া নিয়ে সংশয়ের কথা আগেই বলেছিলেন। তাঁর সেই সংশয়ই সত্য হয়েছে।
গতকাল সোমবার অনন্ত দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত কিছুর পর যে রায় হলো…আমার মনে বড় কষ্ট। আমি নিজে দেখেছি, ছেলের সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। সুরতহাল, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এসব বর্ণনা ছিল না। আমি নিজেই তাই গোয়েন্দাদের কাছে সব বলে এসেছিলাম।’ সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের কারণে খুনিরা ছাড় পেয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে অনন্ত দাস ৪ জানুয়ারি, ২০১৩ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। ওই সম্মেলনে বিশ্বজিৎ দাসের ভাই উত্তম দাস প্রতিবেদন দুটি প্রত্যাখ্যান করেন। অনন্ত দাস অভিযোগ করেন, হত্যাকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে নিম্ন আদালতের রায়ে আটজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছিল। গত রোববার হাইকোর্ট বেঞ্চের রায়ে তাঁদের দুজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল আছে। দুজন খালাস পেয়েছেন। বাকি চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ১৩ জনের দুজন খালাস পেয়েছেন। এই রায় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের মন্তব্যের আলোকে বোঝাই যাচ্ছে, অদক্ষতা ও গাফিলতির কারণে রায় এমন হলো। তদন্তে অদক্ষতা ও গাফিলতি থাকলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দুরূহ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্ত হওয়া উচিত এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর সকাল নয়টার আগে ঢাকার জজকোর্ট এলাকায় ১৮-দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির পক্ষে আইনজীবীরা মিছিল বের করেন। ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি কাজী নজরুল কলেজের ছাত্রলীগ নেতারা তাঁদের ধাওয়া দেন। ভিক্টোরিয়া পার্ক-সংলগ্ন তেলের পাম্পের কাছে তিনটি ককটেল ফুটলে দরজি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস দৌড়ে একটি ডেন্টাল ক্লিনিকের দোতলায় উঠে যান। তখনই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্ররা সেখানে গিয়ে তাঁকে রড দিয়ে পেটাতে থাকেন। ধারালো চাপাতি দিয়ে হাতের নিচে কোপ দেওয়ার পর প্রাণে বাঁচতে বিশ্বজিৎ দৌড়ে নিচে নামেন। কিন্তু রেহাই পাননি। রক্তে ভেসে যেতে থাকা বিশ্বজিৎ শাঁখারীবাজারের রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। একজন রিকশাচালক তাঁকে তুলে নিয়ে যান হাসপাতালে। ৯টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসক বিশ্বজিৎকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থলের ১০-১৫ গজ দূরে পুলিশের লালবাগ জোনের উপকমিশনার হারুনুর রশিদ দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিশ্বজিৎকে খুন হতে দেখেও পুলিশের নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা নিয়ে তখন বেশ সমালোচনা হয়। সে সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাঁর এই বক্তব্যের পর আসামি গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে বিচারের বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠতে থাকে। ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে হত্যাকারী শনাক্ত হওয়ার পরও গ্রেপ্তারের ব্যাপারে পুলিশের আগ্রহ ছিল না।
সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল, চূড়ান্ত রায়েও সেই প্রশ্ন থেকে গেল। আদালত সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল হকের দায়িত্বে অবহেলা ও পেশাগত অসদাচরণ হয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছেন। ফরেনসিক বিভাগের সেই সময়ের সহকারী অধ্যাপক মো. মাকসুদের পেশাগত অসদাচরণ হয়েছে কি না, তা-ও তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত নিয়ে একই প্রশ্ন উঠেছিল ২৪ জানুয়ারি ২০১৩ সালেও। ওই দিন বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী ও বিচারপতি মাহমুদুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। আদালত ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক মো. মাকসুদুর রহমানকে প্রশ্ন করেন, কেউ তাঁকে প্রভাবিত করেছে কি না। বিশ্বজিৎ দাসের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে প্রতিবেদনের সামঞ্জস্য নেই। প্রতিবেদনে বিশ্বজিতের পিঠে, কোমরের ওপর ও পায়ে হালকা জখম। ডান হাতের পাখনার নিচে তিন ইঞ্চি কাটা জখম ও বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচে ছেঁড়া জখম। ভিডিও ফুটেজে অনেক আঘাতের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মূলত একটা জখমের কথা উল্লেখ রয়েছে কেন? আদালতের প্রশ্নের জবাবে চিকিৎসক মাকসুদুর বলেন, ডান পাখনার নিচে ধমনি (আর্টারি) কেটে যাওয়ার কারণে বিশ্বজিৎ মারা যান। আর সুরতহালকারী সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক জাহিদুল হক বলেন, তিনি যা পেয়েছেন তা-ই লিখেছেন।
সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা পুলিশ গতকাল পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেছে, আদালতের পর্যবেক্ষণ যখন আদেশ হিসেবে পুলিশের হাতে পৌঁছায়, তখন সে ব্যাপারে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। আর লাশের সুরতহালের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব পুরোপুরি বর্তায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের ওপর।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসচিব মো. সিরাজুল হক খান প্রথম আলোকে বলেছেন, বিশ্বজিৎ হত্যার রায়ে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তিনি তা শুনেছেন। আদেশ হাতে পেলে মন্ত্রীর নজরে আনবেন। তারপর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মনিরুজ্জামান বলেন, আদালতের নির্দেশ হাতে পেলেই তাঁরা সুরতহাল প্রতিবেদনে কোনো ভুলভ্রান্তি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখবেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
- » সাংবাদিকদের উপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ : ভূমিমন্ত্রীর সংবাদ বর্জনের ঘোষণা
- » বোদায় ১ মেয়র সহ ৯ জনের মনোনয়ন বাতিল
- » বোদায় গৃহবধূর রহস্য জনক মৃত্যু, আটক ১
- » তানোরে একটি পরিবার খোলা আকাশের নিচে দায় নিবে কে ?
- » কুষ্টিয়ায় সহকর্মীর ছুরিকাঘাতে এক যুবক খুন : গ্রেফতার ১
- » সড়ক দূর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক এম. এ ওহাবের ছেলের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন সাংবাদিক ডিউ
- » তানোরে আলু চাষের ধূম
- » স্বর্ণ ব্যবসায়ী যখন ভূমিদূস্যু
- » রাজশাহী অঞ্চলে জঙ্গি উঙ্খান অভিযোগের তীর সাবেক মন্ত্রীর দিকে ?
- » প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে !










Leave a Reply